Skip to main content

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম – ০৮

‘কেমন আছেন আসগর সাহেব?’
‘জি ভালো ।’
‘কীরকম ভালো?’
আসগর সাহেব হাসলেন। তার হাঁসি দেখে মনে হলো না তিনি ভালো। মৃত্যুর ছায়া যাদের চোখে পড়ে তারা এক বিশেষ ধরনের হাসি হাসে । উনি সেই হাসি হাসছেন।
আমি একবার ময়মনসিংহ সেন্ট্রাল জেলে এক ফাঁসির আসামি দেখতে গিয়েছিলাম । ফাঁসির আসামি কীভাবে হাসে সেটা আমার দেখার প্রাপ্ত। ফাঁসির আসামির নাম হোসেন মোল্লা- তাকে খুব স্বাভাবিক মনে হলো। শুধু রাগীর মতো জ্বলজ্বলে চোখ। সেই চোখও অস্থির, একবার এদিকে যাচ্ছে, একার ওদিকে। বেচারার ফাঁসির দিন-তারিখ জেলার সাহেব ঠিক করতে পারছেন না। কারণ, বাংলাদেশে নাকি দুই ভাই আছে যারা বিভিন্ন জেলখানায় ফাঁসি দিয়ে – তারা ডেট দিতে পারছে না। দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্যক্রমে আমি যেদিন গিয়েছি সেদিনই দুই ভাই চলে এসেছে। পরদিন ভোরে হোসেন মোল্লার সময় ধার্য হয়েছে। হোসেন মোল্লা আমাকে শান্ত গলায় বলল, “ভাইসাহেব, এখনও হাতে মেলা সময় । এই ধরেন, আইজ সারা দিন পইরা আছে, তার পরে আছে গোটা একটা রাইত । ঘটনা ঘটনের এখনও মেলা দেরি।” বলেই হোসেন হাসল। সেই হাসি দেখে আমার সারা গায়ে কাটা দিল । প্রেতের হাসি ।



আসগর সাহেবের হাসি দেখেও গায়ে কাঁটা দিল । কী ভয়ংকর হাসি। আমি বললাম, ভাই, আপনার কী হয়েছে? ডাক্তার বলছে কী?
‘আলসার । সারাজীবন অনিয়ম করেছি— খাওয়াদাওয়া সময়মতো হয় নাই, সেখান থেকে আলসার |’
‘পেটে রোলারের গুতাও তো খেয়েছিলেন ।’
‘রোলারের গুতা না খেলেও যা হবার হতো। সব কপালের লিখন, তাই না হিমু ভাই?’
‘তা তো বটেই।’
‘দূরে বসে চিকন কলমে একজন কপালভরতি লেখা লেখেন। সেই লেখার উপরে জীবন চলে ।’
‘হুঁ। মাঝে মাঝে ওনার কলমের কালি শেষ হয়ে যায়, তখন কিছু লেখেন না। মুখে বলে দেন– “যা ব্যাটা, নিজের মতো চরে খা”- এই বলে নতুন কলম নিয়ে অন্য একজনের কপালে লিখতে বসেন।’
‘বড়ই রহস্য এই দুনিয়া!’
”রহস্য তো বটেই— এখন বলুন আপনার চিকিৎসার কী হচ্ছে?’
‘অপারেশন হবার কথা ।’
‘হবার কথা, হচ্ছে না কেন?’
‘দেশে এখন সমস্যা । ডাক্তাররা ঠিকমতো আসতে পারেন না। অল্প সময়ের জন্যে অপারেশন থিয়েটার খোলে । আমার চেয়েও যারা সিরিয়াস তাদের অপারেশন হয় ।’
‘ও আচ্ছা |’
‘মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো ভয়ভীতি নাই হিমু ভাই।’
আমি আবারও বললাম, ও আচ্ছা।
‘ভালোমতো মরতে পারাও একটা আনন্দের ব্যাপার।’
‘আপনি শিগগিরই মারা যাচ্ছেন?’
‘জি ।’
‘মরে গেলে সাত হাজার টাকাটার কি হবে? ঐ লোক যে-কোনোদিন চলে আসতে পারে ।’
‘ও আসবে না ।’
‘বুঝলেন কী করে আসবে না?
‘তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।’
‘তার সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে মানে? সে কি হাসপাতালে এসেছিল?’
‘জি ।’
‘আসগর ভাই, ব্যাপারটা ভালোমতো বুঝিয়ে বলুন তো । আমি ঠিকমতো বুঝতে পারছি না ।’
আসগর সাহেব মৃদু গলায় কথা বলতে শুরু করলেন। বোঝা যাচ্ছে যা বলছেন–খুব আগ্রহ নিয়ে বলছেন।



‘বুঝলেন হিমু ভাই- প্রচণ্ড ব্যথার জন্য রাতে ঘুমাতে পারি না। গত রাতে ডাক্তার সাহেব একটা ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। রাত তিনটার দিকে ঘুমটা ভেঙে গেল। দেখি খুব পানির পিপাসা। হাতের কাছ টেবিলের উপর একটা পানির জগ আছে। জগে পানি নাই । জেগে আছি- নার্সদের কেউ এদিকে আসলে পানির কথা বলব- কেউ আসছে না। হঠাৎ কে যেন দুবার কাশল । আমার টেবিল উত্তর দিকে— কাশিটা আসল দক্ষিণ দিক থেকে। মাথা ঘুরিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। দেখি- মনসুর ‘
‘মনসুর কে?’
‘যে আমাকে সাত হাজার এক টাকা দিয়ে গিয়েছিল- সে ।’
‘ও আচ্ছা ।’
‘আমি গেলাম রেগে । এই লোকটা আমাকে কী যন্ত্রণায় ফেলেছে ভেবে দেখুন দেখি! আমি বললাম, তোমার ব্যাপারটা কী? কোথায় ছিলে তুমি? তুমি কি জান তুমি আমাকে কী যন্ত্রণায় ফেলেছ? মনসুর চুপ করে রইল। মাথাও তোলে না। আমি বললাম, কথা বল না কেন? শেষে সে বলল, ভাইজান, আমি আসব ক্যামনে? আমার মৃত্যু হয়েছে। আপনে যেমন মনঃকষ্টে আছেন আমিও মনঃকষ্টে আছি। এত কষ্টের টাকা পরিবাররে পাঠাইতে পারি নাই ।
আমি বললাম, তুমি ঠিকানা বলো আমি পাঠিয়ে দিব। টাকার পরিমাণ আরও বেড়েছে। পোস্টাপিসের পাসবইয়ে টাকা রেখে দিয়েছিলাম। বেড়ে ডবলের বেশি হবার কথা। আমি খোজ নেই নাই। তুমি ঠিকানাটা বলো ।



মনসুর আবার মাথা নিচু করে ফেলল। আমি বললাম, কথা বলো। চুপ করে আছ কেন? মনসুর বলল, ঠিকানা মনে নাই স্যার। পরিবারের নামও মনে নাই – বলেই কান্না শুরু করল। তখন একজন নার্স ঢুকল— তাকিয়ে দেখি মনসুর নাই। আমি নার্সকে বললাম, সিস্টার, পানি খাব । তিনি আমাকে পানি খাইয়ে চলে গেলেন। আমি সারারাত জেগে থাকলাম মনসুরের জন্যে। তার আর দেখা পেলাম না। এই হচ্ছে হিমু ভাই ঘটনা ।’
‘এটা কোনো ঘটনা না- এটা স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখেছেন।’
‘জি না ভাইসাহেব, স্বপ্নে না। স্পষ্ট চোখের সামনে দেখা। মনসুর আগের মতেই আছে, তার কোনো পরিবর্তন হয় নাই।’
‘আসগর ভাই, মনসুর মরে ভূত হয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছে? আপনার কথা ভুলে গেছে- অথচ পরিবারের নাম-ঠিকানা ভুলে গেছে– এটা কি হয়? হয় না। এই ধরনের ঘটনা স্বপ্নে ঘটে। আপনাকে ইনজেক

Comments

Popular posts from this blog

হিমুর_হাতে_কয়েকটি_নীলপদ্ম (১৯৯৬)-পর্ব-০১

আমার প্রথম পোষ্ট শুরু করতে চাই আমার প্রিয় কবি হুমায়ূন আহমেদের এবং তার লেখা আমার পছন্দের উপন্যাস #হিমু দিয়ে। # হিমুর_হাতে_কয়েকটি_নীলপদ্ম (১৯৯৬)-পর্ব-০১ আজকের দিনটা এত সুন্দর কেন? সকালবেলা জানালা খুলে আমি হতভম্ব। এ কী! আকাশ এত নীল! আকাশের তো এত নীল হবার কথা না। ভূমধ্যসাগরীয় আকাশ হলেও একটা কথা ছিল। এ হচ্ছে খাটি বঙ্গদেশীয় আকাশ, বেশিরভাগ সময় ঘোলা থাকার কথা। আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই জানালার ওপাশে একটা কাক এসে বসল। কী আশ্চর্য! কাকটাকেও তো সুন্দর লাগছে। কেমন গর্বিত ভঙ্গিতে হাটছে। কলেজে ভরতি হবার পরদিন যে-ভঙ্গিতে কিশোরী মেয়েরা হাটে অবিকল সেই—“বড় হয়ে গেছি” ভঙ্গি। আমি মুগ্ধ হয়ে কাকটাকে দেখলাম। কাকের চোখ এত কালো হয়? কবি- সাহিত্যিকরা কি এই কারণেই বলেন কাকচক্ষু জল? আচ্ছা, আজ সব সুন্দর সুন্দর জিনিস চোখে পড়ছে কেন আজকের তারিখটা কত? দিন- তারিখের হিসাব রাখি না, কাজেই তারিখ কত বলতে পারছি না। একটা খবরের কাগজ কিনে তারিখটা দেখতে হবে । মনে হচ্ছে আজ একটা বিশেষ দিন । আজকের দিনটার কিছু-একটা হয়েছে। এই দিনে অদ্ভুত ব্যাপার ঘটবে। পৃথিবী তার রূপের দরজা আজকের দিনটার জন্যে ...

গল্প সমগ্র (হুমায়ূন আহমেদ) চোখ (১ম অংশ)

চোখ হুমায়ূন আহমেদ ভোর ছটায় কেউ কলিং বেল টিপতে থাকলে মেজাজ বিগড়ে যাবার কথা। মিসির আলির মেজাজ তেমন বিগড়াল না। সকাল দশটা পর্যন্ত কেন জানি তাঁর মেজাজ বেশ ভালো থাকে। দশটা থে...

 হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম পর্ব ৫

গল্প-উপন্যাসে “পাখি-ডাকা ভোর” বাক্যটা প্রায়ই পাওয়া যায় । যারা ভোরবেলা পাখির ডাক শোনেন না তাদের কাছে ‘পাখি-ডাকা ভোরের” রোমান্টিক আবেদন আছে। লেখকরা কিন্তু পাঠকদের বিভ্রান্ত করেন- তারা পাখি-ডাকা ভোর বাক্যটায় পাখির নাম বলেন না। ভোরবেলা যে- পাখি ডাকে তার নাম কাক । ‘কাক- ডাকা ভোর’ লিখলে ভোরবেলার দৃশ্যটি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যেত। কাকের কা-কা শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। খুব একটা খারাপ লাগল তা না। কা-কা শব্দ যত কৰ্কশই হোক, শব্দটা আসছে পাখির গলা থেকেই। প্রকৃতি অসুন্দর কিছু সৃষ্টি করে না—কাকের মধ্যেও সুন্দর কিছু নিশ্চয়ই আছে। সেই সুন্দরটা বের করতে হবেএই ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকে নামলাম। তার পরই মনে হলো—এত ভোরে বিছানা থেকে শুধু শুধু কেন নামছি? আমার সামনে কোনো পরীক্ষা নেই যে হাতমুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসতে হবে। ভোরে ট্রেন ধরার জন্যে স্টেশনে ছুটতে হবে না। চলছে অসহযোগের ছুটি । শুধু একবার ঢাকা মেডিকেলে যেতে হবে। আসগর সাহেবের খোজ নিতে হবে। খোজ না নিলেও চলবে। আমার তো কিছু করার নেই। আমি কোনো চিকিৎসক না। আমি অতি সাধারণ হিমু। কাজেই আরও খানিকক্ষণ শুয়ে থাকা যায়। চৈত্রমাসের শুরুর ভোর...