ফুপা টেলিগ্রামের ভাষায় চিঠি পাঠিয়েছেন–
Emergency come sharp.
চিঠি নিয়ে এসেছে তার অফিসের পিওন। সে যাচ্ছে না, চিঠি হাতে দিয়ে চোখমুখ শক্ত করে দাড়িয়ে আছে। আমি বললাম, কী ব্যাপার?
সে শুকনা গলায় বলল, বখশিশ ।
‘বখশিশ কিসের? তুমি ভয়ংকর দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছ। তোমকে যে ধরে মার লাগাচ্ছি না এই যথেষ্ট । ভালো খবর আনলে বখশিশ পেতে। খুবই খারাপ সংবাদ ।’
‘রিকশা-ভাড়া দেন। যামু ক্যামনে?’
‘পায়দল চলে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে দৃশ্য দেখতে দেখতে যাবে। তা ছাড়া রিকশাভাড়া দিলেও লাভ হবে না— আজ রিকশা চলছে না। ভয়াবহ হরতাল ।
‘রিকশা টুকটাক চলতাছে।’
‘টুকটাক যেসব রিকশা চলছে তাতে চললে বোমা খাবে। জেনেশুনে কাউকে কি বোমা খাওয়ানো যায়? তুমি কোন দল কর?’
‘কোনো দল করি না।’
‘বল কী! আওয়ামী লীগ, বিএনপি না?’
‘জ্বে না।’
‘ভোট কাকে দাও?’
‘ভোট দেই না ।’
‘তুমি তা হলে দেখি নির্দলীয় সরকারের লোক। এরকম তো সচরাচর পাওয়া যায় না! নাম কী তোমার?’
‘মোহাম্মদ আবদুল গফুর।’
‘গফুর সাহেব, রিকশা-ভাড়া তোমাকে দিচ্ছি। আমার কাছে একটা পয়সা নেই। ধার করে এনে দিতে হবে। ভাড়া কত?’
‘কুড়ি টাকা ।’
‘বল কী! এখান থেকে মতিঝিল কুড়ি টাকা?’
‘হরতালের টাইমে রিকশা-ভাড়া ডাবল ।’
‘তা তো বটেই। দাঁড়াও, আমি টাকা জোগাড় করে আনি। তবে একটা কথা বলি—কুড়ি টাকা পকেটে নিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে যাবে। রিকশায় উঠলেই বোমা খাবে।’
গফুর রাগি-রাগি চোখে তাকাল। আমি মধুর ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললাম, আমি আসলে একজন মহাপুরুষ । ভবিষ্যৎ চোখের সামনে দেখতে পাই । এইজন্যে সাবধান করে দিচ্ছি।
‘জ্বে আচ্ছা।’
মোহাম্মদ আবদুল গফুর মুখ বেজার করে বসে রইল। আমি মেসের ম্যানেজারের কাছ থেকে কুড়ি টাকা ধার করলাম। মেস-ম্যানেজারের মুখ বেজার হয়ে গেল । মোহাম্মদ আবদুল গফুরের মুখে হাসি ফুটল। এখন এই মেস-ম্যানেজার তার বেজার ভাব অন্যজনের উপর ঢেলে দেবে । সে আবার আরেকজনকে দেবে। বেজার ভাব চেইন রিঅ্যাকশনের মতো চলতে থাকবে । আনন্দ চেইন রিঅ্যাকশনে প্রবাহিত করা যায় নানিরানন্দ করা যায়।
ফুপার চিঠি-হাতে ঝিম ধরে খানিকক্ষণ বসে কাটালাম। ঘটনা কী আঁচ করতে চেষ্টা করলাম। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বাদল কি দেশে? ছুটি কাটাতে এসে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা বাধিয়েছে এইটুকু অনুমান করা যায়। বাদল উদ্ভট কিছু করছে, কেউ তাকে সামলাতে পারছে না। ওঝা হিসেবে আমার ডাক পড়েছে। আমি মন্ত্র পড়লেই কাজ দেবে, কারণ বাদলের কাছে আমি হচ্ছি ভয়াবহ ক্ষমতাসম্পন্ন এক মহাপুরুষ। আমি যদি সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলি, এই ব্যাটা সূর্য, দীর্ঘদিন তো পূর্ব দিকে উঠলি- এবার একটু পশ্চিম দিকে ওঠ-পূর্ব দিকে তোর উদয় দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে গেছে- তা হলে সূর্য তৎক্ষণাৎ আমার কথা শুনে পশ্চিম দিকে উঠবে।
বাদল শুধু যে বুদ্ধিমান ছেলে তা না, বেশ ছেলে । মারিয়ার সাংকেতিক চিঠির পাঠোদ্ধার করতে তার তিন মিনিট লেগেছে। এই ছেলে আমার সম্পর্কে কী ধারণা করে কী করে আমি জানি না। আমি যদি হিমু-ধর্ম নামে নতুন কোনো ধর্মপ্রচার শুরু করি তা হলে অবশ্যই সে হবে আমার প্রথম শিষ্য। এবং এই ধর্ম প্রচারের জন্য সে হবে প্রথম শহীদ। বাদল ছাড়াও কিছু শিষ্য পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা। আসগর সাহেব শিষ্য হবেন। ধর্মে মুগ্ধ হয়ে হবেন তা না- ভদ্রলোক শিষ্য হবেন আমাকে খুশি করার জন্যে। কোনোরকম কারণ ছাড়া তিনি আমার প্রতি অন্ধ একটা টান অনুভব করেন। আসগর সাহেব ছাড়া আর কেউ কি শিষ্য হবে? কানা কুদ্দুস কি হবে? সম্ভাবনা আছে। সেও আমাকে পছন্দ করে। তাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, মানুষ মারতে কেমন লাগে কুদ্দুস? |
সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, ভালোমন্দ কোনোরকম লাগে না।
‘বটি দিয়ে লাউ কাটতে যেমন লাগে তেমন “কচ” একটা শব্দ?’
‘ঠিক সেইরকম না ভাইজান। মরণের সময় মানুষ চিল্লাফাল্লা কইরা বড় ত্যক্ত করে। লাউ তো আর চিল্লাফাল্লা করে না।’
‘তা তো বটেই। চিল্লাফাল্লার জন্যে খারাপ লাগে?’
‘জি না, খারাপ লাগে না। চিল্লাফাল্লাটা করবই। মৃত্যু বলে কথা! মৃত্যু কোনো সহজ ব্যাপার না। ঠিক বললাম না?’
‘অবশ্যই ঠিক । কুদ্দুস মিয়া উদাস ভঙ্গিতে বলল, আপনেরে কেউ ডিসটার্ব করলে নাম-ঠিকানা দিয়েন।
‘নাম-ঠিকানা দিলে কী করবে? “কচ” ট্রিটমেন্ট? কচ করে লাউ-এর মতো কেটে ফেলবে?’
‘সেইটা আমার বিষয়, আমি দেখব। আফনের কাম নাম-ঠিকানা দেওন।
‘আচ্ছা, মনে থাকল।’
‘আরেকটা ঠিকানা দিতেছি। ধরেন কোনো বিপদে পড়ছেন— পুলিশ আফনেরে খুঁজতেছে। আশ্রয় দরকার-দানাপানি দরকার। এই ঠিকানায় উপস্থিত হইয়া বলবেন, আমার নাম হিমু। ব্যবস্থা হবে। আমি অ্যাডভান্স আফনের কথা বইল্যা রাখছি। বলছি হিমু ভাই আমার ওস্তাদ।’
‘আমি হিমু’ এই কথাটা কাকে বলতে হবে?’
দরজায় তিনটা টোকা দিয়া একটু থামবেন, আবার তিন টোকা…এই হইল সিগনাল— তখন যে দরজা খুলব তারে বলবেন ।’
‘দরজা কে খুলবে?’
‘আমার মেয়েমানুষ দরজা খুলব। নাম জয়গুন । চেহারা বড় বেশি বিউটি। মনে হবে সিনেমার নায়িকা ।’
‘খুব মোটাগাটা?’
Emergency come sharp.
চিঠি নিয়ে এসেছে তার অফিসের পিওন। সে যাচ্ছে না, চিঠি হাতে দিয়ে চোখমুখ শক্ত করে দাড়িয়ে আছে। আমি বললাম, কী ব্যাপার?
সে শুকনা গলায় বলল, বখশিশ ।
‘বখশিশ কিসের? তুমি ভয়ংকর দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছ। তোমকে যে ধরে মার লাগাচ্ছি না এই যথেষ্ট । ভালো খবর আনলে বখশিশ পেতে। খুবই খারাপ সংবাদ ।’
‘রিকশা-ভাড়া দেন। যামু ক্যামনে?’
‘পায়দল চলে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে দৃশ্য দেখতে দেখতে যাবে। তা ছাড়া রিকশাভাড়া দিলেও লাভ হবে না— আজ রিকশা চলছে না। ভয়াবহ হরতাল ।
‘রিকশা টুকটাক চলতাছে।’
‘টুকটাক যেসব রিকশা চলছে তাতে চললে বোমা খাবে। জেনেশুনে কাউকে কি বোমা খাওয়ানো যায়? তুমি কোন দল কর?’
‘কোনো দল করি না।’
‘বল কী! আওয়ামী লীগ, বিএনপি না?’
‘জ্বে না।’
‘ভোট কাকে দাও?’
‘ভোট দেই না ।’
‘তুমি তা হলে দেখি নির্দলীয় সরকারের লোক। এরকম তো সচরাচর পাওয়া যায় না! নাম কী তোমার?’
‘মোহাম্মদ আবদুল গফুর।’
‘গফুর সাহেব, রিকশা-ভাড়া তোমাকে দিচ্ছি। আমার কাছে একটা পয়সা নেই। ধার করে এনে দিতে হবে। ভাড়া কত?’
‘কুড়ি টাকা ।’
‘বল কী! এখান থেকে মতিঝিল কুড়ি টাকা?’
‘হরতালের টাইমে রিকশা-ভাড়া ডাবল ।’
‘তা তো বটেই। দাঁড়াও, আমি টাকা জোগাড় করে আনি। তবে একটা কথা বলি—কুড়ি টাকা পকেটে নিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে যাবে। রিকশায় উঠলেই বোমা খাবে।’
গফুর রাগি-রাগি চোখে তাকাল। আমি মধুর ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললাম, আমি আসলে একজন মহাপুরুষ । ভবিষ্যৎ চোখের সামনে দেখতে পাই । এইজন্যে সাবধান করে দিচ্ছি।
‘জ্বে আচ্ছা।’
মোহাম্মদ আবদুল গফুর মুখ বেজার করে বসে রইল। আমি মেসের ম্যানেজারের কাছ থেকে কুড়ি টাকা ধার করলাম। মেস-ম্যানেজারের মুখ বেজার হয়ে গেল । মোহাম্মদ আবদুল গফুরের মুখে হাসি ফুটল। এখন এই মেস-ম্যানেজার তার বেজার ভাব অন্যজনের উপর ঢেলে দেবে । সে আবার আরেকজনকে দেবে। বেজার ভাব চেইন রিঅ্যাকশনের মতো চলতে থাকবে । আনন্দ চেইন রিঅ্যাকশনে প্রবাহিত করা যায় নানিরানন্দ করা যায়।
ফুপার চিঠি-হাতে ঝিম ধরে খানিকক্ষণ বসে কাটালাম। ঘটনা কী আঁচ করতে চেষ্টা করলাম। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বাদল কি দেশে? ছুটি কাটাতে এসে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা বাধিয়েছে এইটুকু অনুমান করা যায়। বাদল উদ্ভট কিছু করছে, কেউ তাকে সামলাতে পারছে না। ওঝা হিসেবে আমার ডাক পড়েছে। আমি মন্ত্র পড়লেই কাজ দেবে, কারণ বাদলের কাছে আমি হচ্ছি ভয়াবহ ক্ষমতাসম্পন্ন এক মহাপুরুষ। আমি যদি সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলি, এই ব্যাটা সূর্য, দীর্ঘদিন তো পূর্ব দিকে উঠলি- এবার একটু পশ্চিম দিকে ওঠ-পূর্ব দিকে তোর উদয় দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে গেছে- তা হলে সূর্য তৎক্ষণাৎ আমার কথা শুনে পশ্চিম দিকে উঠবে।
বাদল শুধু যে বুদ্ধিমান ছেলে তা না, বেশ ছেলে । মারিয়ার সাংকেতিক চিঠির পাঠোদ্ধার করতে তার তিন মিনিট লেগেছে। এই ছেলে আমার সম্পর্কে কী ধারণা করে কী করে আমি জানি না। আমি যদি হিমু-ধর্ম নামে নতুন কোনো ধর্মপ্রচার শুরু করি তা হলে অবশ্যই সে হবে আমার প্রথম শিষ্য। এবং এই ধর্ম প্রচারের জন্য সে হবে প্রথম শহীদ। বাদল ছাড়াও কিছু শিষ্য পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা। আসগর সাহেব শিষ্য হবেন। ধর্মে মুগ্ধ হয়ে হবেন তা না- ভদ্রলোক শিষ্য হবেন আমাকে খুশি করার জন্যে। কোনোরকম কারণ ছাড়া তিনি আমার প্রতি অন্ধ একটা টান অনুভব করেন। আসগর সাহেব ছাড়া আর কেউ কি শিষ্য হবে? কানা কুদ্দুস কি হবে? সম্ভাবনা আছে। সেও আমাকে পছন্দ করে। তাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, মানুষ মারতে কেমন লাগে কুদ্দুস? |
সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, ভালোমন্দ কোনোরকম লাগে না।
‘বটি দিয়ে লাউ কাটতে যেমন লাগে তেমন “কচ” একটা শব্দ?’
‘ঠিক সেইরকম না ভাইজান। মরণের সময় মানুষ চিল্লাফাল্লা কইরা বড় ত্যক্ত করে। লাউ তো আর চিল্লাফাল্লা করে না।’
‘তা তো বটেই। চিল্লাফাল্লার জন্যে খারাপ লাগে?’
‘জি না, খারাপ লাগে না। চিল্লাফাল্লাটা করবই। মৃত্যু বলে কথা! মৃত্যু কোনো সহজ ব্যাপার না। ঠিক বললাম না?’
‘অবশ্যই ঠিক । কুদ্দুস মিয়া উদাস ভঙ্গিতে বলল, আপনেরে কেউ ডিসটার্ব করলে নাম-ঠিকানা দিয়েন।
‘নাম-ঠিকানা দিলে কী করবে? “কচ” ট্রিটমেন্ট? কচ করে লাউ-এর মতো কেটে ফেলবে?’
‘সেইটা আমার বিষয়, আমি দেখব। আফনের কাম নাম-ঠিকানা দেওন।
‘আচ্ছা, মনে থাকল।’
‘আরেকটা ঠিকানা দিতেছি। ধরেন কোনো বিপদে পড়ছেন— পুলিশ আফনেরে খুঁজতেছে। আশ্রয় দরকার-দানাপানি দরকার। এই ঠিকানায় উপস্থিত হইয়া বলবেন, আমার নাম হিমু। ব্যবস্থা হবে। আমি অ্যাডভান্স আফনের কথা বইল্যা রাখছি। বলছি হিমু ভাই আমার ওস্তাদ।’
‘আমি হিমু’ এই কথাটা কাকে বলতে হবে?’
দরজায় তিনটা টোকা দিয়া একটু থামবেন, আবার তিন টোকা…এই হইল সিগনাল— তখন যে দরজা খুলব তারে বলবেন ।’
‘দরজা কে খুলবে?’
‘আমার মেয়েমানুষ দরজা খুলব। নাম জয়গুন । চেহারা বড় বেশি বিউটি। মনে হবে সিনেমার নায়িকা ।’
‘খুব মোটাগাটা?’
Comments
Post a Comment